পরিমাপের প্রয়োজনেই অভীক্ষার আবির্ভাব। কোন কিছু পরিমাপ করার জন্য আমরা পরিমাপ যন্ত্র ব্যবহার করি। যেমন ওজন পরিমাপের জন্য দাড়িপাল্লা বা ওজন যন্ত্র, কাপড় পরিমাপের জন্য ফিতা বা গজ, আবার জ্বর পরিমাপের জন্য থার্মোমিটার। তেমনি অভীক্ষার মাধ্যমেও আমরা পরিমাপ করি। তবে সে পরিমাপ কোন পার্থিব বস্তুর নয়। অভীক্ষার মাধ্যমে আমরা শিখন পরিমাপ করি, কোন বিশেষ জ্ঞান পরিমাপ করি, পরিমাপ করি কোন যোগ্যতা কিংবা শিখনফল। আর এ জন্যই বলা হয় অভীক্ষা হল শিখন বা যোগ্যতা পরিমাপের বিশেষ পদ্ধতি কিংবা শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি যাচাইয়ের কৌশল। সাধারণভাবে যদি আমরা একটি অভীক্ষার দিকে তাকাই তাহলে অভীক্ষাকে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছাড়া কিছুই মনে হবে না। কিন্তু গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে অভীক্ষার একটি একটি প্রশ্ন (যা অভীক্ষাপদ নামে পরিচিত) শিক্ষার্থীর একটি একটি বিশেষ জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিমাপ করছে।
আবার শিখনের ধরণ ও শ্রেণির ভিত্তিতে অভীক্ষা ধরণ ও অবয়ব ভিন্ন হয়। আপনি যদি আপনার ব্লাড প্রেসার এবং ডায়াবেটিকস পরীক্ষা করতে কোন ক্লিনিকে যান তবে দেখবেন ডাক্তার ব্লাড প্রেসার মাপার জন্য একধরণের জন্য মেশিন ব্যবহার করেছেন আবার ডায়াবেটিকস পরীক্ষার জন্য অন্য ধরনের মেশিন ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ যা পরিমাপ করা হবে তার ধরণ ও প্রকৃতির পার্থক্য অনুসারে পরিমাপযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিকস মাপার যন্ত্র যেমন এক হবে না তেমনি শিক্ষার্থীর সকল বিষয়ের অর্জিত যোগ্যতা পরিমাপের অভীক্ষাও এক হবে না। আর এজন্যই ভাষার (বাংলা ও ইংরেজি) দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য একধরণের অভীক্ষা তৈরি করা হয় এবং গণিতের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আরেক ধরণের অভীক্ষা তৈরি করা হয়। আবার ভাষা অভীক্ষা (বাংলা বা ইংরেজি) র উদ্দেশ্য যেমন শুধু ভাষা জ্ঞান, দক্ষতা যাচাই তেমনি গণিত অভীক্ষার উদ্দেশ্য গণিতের যোগ্যতা যাচাই, ভাষার যোগ্যতা যাচাই করা নয়।
অভীক্ষার জন্ম প্রায় দুহাজার বছর আগে প্রাচীন চীনে। চীনের মহামতি শান এর শাসনামলে। উদ্দেশ্য ছিল নিদিষ্ট পদে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতা পরিমাপ করে যোগ্য কর্মচারী নিয়োগ। সেই থেকে আজ অবধি অভীক্ষা ছিল, অভীক্ষা আছে তবে তা কালে কালে রূপায়িত হয়েছে নানা অবয়বে। উনিশ শতক পর্যন্ত অভীক্ষা ছিল গতানুগতিক ও যান্ত্রিক। অভীক্ষক (যিনি অভীক্ষা প্রণয়ন করেন) মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য দিয়ে পুস্তকে লিখিত বিষয়ের উপরই সীমাবদ্ধ ছিলেন এবং পরীক্ষক (যিনি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন) পুস্তকে লিখিত বিষয় হুবহু উত্তরপত্রে উদগীরণ করতে পারলেই সন্তোষ প্রকাশ করতেন। উনিশ শতকের শেষের দিক হতে শিক্ষাদর্শন এবং শিখন শেখানোর ওপর অনেক গবেষণা শুরু হয়। ফলে পরিবর্তন আসে শিক্ষা লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায়। এর ছোঁয়া লাগে অভীক্ষা প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং মূল্যায়নেও। কীভাবে নিখুতভাবে শিখন পরিমাপ করা যায় তার ওপর চলে হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণা যা আজও চলমান। কেননা কাঙ্খিত যোগ্যতার কতটুকু শিক্ষার্থীরা অর্জন করেছে, অর্জিত যোগ্যতা তাদের মন ও মননে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছে, তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে - এগুলোর যথাযথ পরিমাপের ওপর শিক্ষা প্রক্রিয়ার পরিবর্তন-পরিমার্জন নির্ভর করে।
আজকাল প্রায়ই দেখা যায় কোন পরীক্ষার্থী কোন বিষয়ে এ প্লাস পাওয়ার পরও ঐ বিষয়ে তার দক্ষতা হতাশাজনক অর্থাৎ অভীক্ষায় প্রাপ্ত গ্রেড এবং তার বাস্তব পারদর্শিতা সংগতিপূর্ণ নয়। কিংবা পরীক্ষার্থীরা, অভিভাবকরা এবং শিক্ষাবিদরাও অভীক্ষার অভীক্ষাপদ (প্রশ্ন) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসব কিছুর কারণ কী হতে পারে? এর একটি কারণ হতে পারে যে অভীক্ষাটি সুঅভীক্ষা নয়। গঠনগত বা উদ্দেশ্যগত ভাবে অভীক্ষাপদগুলো ত্রুটিপূর্ণ। সুঅভীক্ষা মানেই সুপরিমাপক। অভীক্ষা ভালো হলে শিখন যাচাই সঠিক হবে। আর শিখন পরিমাপ সঠিক হলেই প্রাপ্ত গ্রেড বা স্কোর এবং পারদর্শিতার সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে। এজন্যই অভীক্ষককে অভীক্ষাপদ তৈরির সময় কিছু বৈশিষ্ট্যেগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয়েই একটি অভীক্ষাপদ সুঅভীক্ষাপদে পরিনত হয়।
have a question
have a question
0 মন্তব্যসমূহ